মধ্যপ্রাচ্যের বিলাসবহুল ঘড়ির বাজারে বেশ জোরেশোরেই শোনা যাচ্ছে নতুন সংগ্রাহকদের পদধ্বনি। বাজারে তাদের প্রভাব এতই বেশি যে মধ্যপ্রাচ্যের কথা মাথায় রেখে বিলাসী ঘড়িগুলোর ডিজাইন, প্রযুক্তি থেকে শুরু করে প্রায় সবকিছু নিয়েই নির্মাতারা ভাবছেন নতুন করে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের কথা মাথায় রেখে প্রতিনিয়ত এখানে তৈরি হচ্ছে এক্সক্লুসিভ ও কাস্টমাইজড ঘড়ি। খবর দ্য ন্যাশনাল।
মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই বিলাসবহুল পণ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। উচ্চমূল্যের বিলাসবহুল ঘড়ির চাহিদাও এখানে অনেক বেশি। এক্সক্লুসিভ, লিমিটেড এডিশনের পাশাপাশি ট্র্যাডিশনাল ঘড়ির প্রতিও আগ্রহ রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতের সংগ্রাহকদের। যে কারণে মধ্যপ্রাচ্যে এ বাজারের বিস্তৃতি ক্রমেই বাড়ছে। বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালে মধ্যপ্রাচ্যের বিলাসবহুল পণ্যবাজারের আকার ছিল প্রায় ১ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে এটি ৩ হাজার ১৭০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংগ্রাহকরা কেবল ব্র্যান্ডের খ্যাতির ওপর নির্ভর করেন না। তাদের বিশেষত্ব হলো, ব্যক্তিগত ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ঘড়ির ডিজাইনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চান তারা। এ কারণেই শীর্ষস্থানীয় সুইস ঘড়ি নির্মাতারা এখন আরবি সংখ্যা, ঐতিহ্যবাহী মোটিফ ও শিল্পকর্ম সংযোজিত ডিজাইন তৈরি করছে। এর মধ্যে রিজার্ভোয়ার ব্র্যান্ড সংযুক্ত আরব আমিরাতের শিল্পী আবদুল্লাহ লুতফির সঙ্গে কাজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের সংগ্রাহকদের চাহিদাকে প্রাধান্য দিতে। এছাড়া আরো অনেক নামিদামি ঘড়ির ব্র্যান্ড তাদের নকশায় মধ্যপ্রাচ্যের সাংস্কৃতিক উপাদান যোগ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিলাসবহুল ঘড়ি সংগ্রাহকদের বিশেষত্বের কোনো কমতি নেই। ঘড়ির ডিজাইন বা প্রযুক্তিতেই শুধু নয়, তারা ঘড়ির কেস, ডায়াল, এমনকি যান্ত্রিক কাঠামোয়ও কাস্টমাইজড ডিজাইনের জন্য অনুরোধ করছেন। জ্যাগার-লেকুল্ট্রের মতো ব্র্যান্ডগুলো এমন পরিষেবা দিচ্ছে, যেখানে সংগ্রাহকরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী ঘড়ির ডিজাইন পরিবর্তন করতে পারেন। অনেক সংগ্রাহক আবার তাদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ইতিহাস প্রতিফলিত করতে বিশেষ মোটিফ ও খোদাইয়ের মাধ্যমে কাস্টমাইজড করে নিচ্ছেন ঘড়ি।
বিশ্বব্যাপী বিলাসবহুল ঘড়ি শিল্পে সুইস ঘড়ি নির্মাতারা নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন এসব কারণে। ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলার প্রতি নতুন আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে তাদের। তারা আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী কারুকাজ যেমন হস্তশিল্প খোদাই, গিলোশে ও ক্লোইসনে এনামেলের কাজ সংযুক্ত করছেন।
এ সংগ্রাহকরা কেবল বিরল ও বিশেষ সংস্করণের ঘড়ি সংগ্রহ করেই থেমে থাকছেন না, ঘড়ি শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। হাই-এন্ড ঘড়ির বাজারে ক্রমে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রেতাদের দৃঢ় উপস্থিতি এবং ঐতিহ্য, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র ও সংস্কৃতির মিশেলে তৈরি হওয়া রুচি বিশ্বব্যাপী ঘড়ি শিল্পের ভবিষ্যৎকে নতুন রূপ দিচ্ছে। রোলেক্স ডে ডেট বা রয়্যাল ওকের মতো ঘড়িতে ঐতিহ্যবাহী মধ্যপ্রাচ্যের মোটিফ, মূল্যবান ধাতু ও রত্নখচিত নকশা যুক্ত করা হচ্ছে।
দুবাই ওয়াচ উইকের মতো ইভেন্টগুলো এ পরিবর্তনকে আরো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরছে। শুধু সময় দেখানোর যন্ত্র হিসেবে নয়, ঘড়ি এখন সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংগ্রাহকরা কেবল স্থানীয় বাজারকে প্রভাবিত করছেন না, তারা নকশা ও ভোক্তাদের পছন্দেও পরিবর্তন আনছেন। তাদের অনন্য রুচি, শিল্পকর্ম ও ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা বিশ্বব্যাপী ঘড়ি নির্মাতাদের নতুন সৃজনশীলতা অন্বেষণে উৎসাহিত করছে। তাদের চাহিদার ফলে বিলাসবহুল ঘড়ি নির্মাতারা নতুন ডিজাইনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, যা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের এক নিখুঁত মেলবন্ধন তৈরি করছে।